Style Switcher
Theme Colors

বিশ্লেষণ

নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের চাওয়া

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

 
শরীফুর রহমান আদিল
 

সামনেই একাদশ জাতীয় নির্বাচন। এ নিয়ে দেশে উৎসবের আমেজ লক্ষ করা যাচ্ছে। দশম জাতীয় নির্বাচন একপক্ষীয় হলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি দলই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে বিভিন্ন বিষয়ের জনসাধারণকে আশ^স্ত করা হয়। এসব অনেক সময় বাস্তবায়িত হয় আবার অনেক সময় বাস্তবায়িত হয় না। তবে এবারে সব রাজনৈতিক দলেরই নজর তরুণ প্রজন্মের ভোটের দিকে। আর তরুণ প্রজন্মের ভোট অনেকটাই নির্ভর করছে নির্বাচনী ইশতেহারে তাদের চাহিদাসমূহ উল্লেখ থাকে কি না তার ওপর।

কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা : ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিবিএসের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ। আর এ হার দিন দিন বাড়ছে। আর বেকারত্ব না ঘুচাতে পেরে সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকার পরও চাকরি না পেয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর প্রতিনিয়ত পত্রিকায় ছাপানো হচ্ছে। সুতরাং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থান গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ও তা বাস্তবায়নের সময়সীমা উল্লেখ করে নির্বাচনী ইশতেহারে সংযুক্ত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সংসদীয় আসনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা ৫০ হাজারেরও ওপর। সুতরাং এসব ভোটারের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হলে তাদের মূল সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব ভোটারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

ঘুষবিহীন চাকরির নিশ্চয়তা : বাংলাদেশের চাকরি বর্তমান বাজারে সোনার হরিণের চেয়েও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি আসনে ৩০০ জনের ওপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় আর এ সুযোগে ৩০০ জনকে টপকিয়ে নিজের আসনটি নিশ্চিত করতে ঘুষের লেনদেন সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ছে। এ অনৈতিক উপায় বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে। এমনকি কোথাও ঘুষের দ্বারা যদি চাকরি পাওয়া বা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরিদাতা ও চাকরিগ্রহণকারী উভয়ের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘোষণা দেওয়া।

নৈতিক দফতর প্রতিষ্ঠা : দেশে উন্নয়নের পাশাপাশি চরমভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে অনৈতিক কর্মকান্ড। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে উন্নয়নের সঙ্গে সর্বত্রই অনৈতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পেয়েছে ৯০ শতাংশ। এখন প্রায় সব মানুষের মনেই অনৈতিক মানসিকতা বিদ্যমান। এসব অনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধে সরকারকে নৈতিক দফতর প্রতিষ্ঠা ও পাঠ্যবইয়ে নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া নৈতিক আইন প্রণয়ন করে তা দফতর কিংবা কমিশনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করার বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করার দাবি সচেতন তরুণদের।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি : দেশের মোট ভোটারের সংখ্যা ১৮ শতাংশই তরণ ভোটার। তারা অনেক দিন ধরেই চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করার জন্য আন্দোলন করেছে এবং এর সপক্ষে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মসূচি ও বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেছে। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গত জুনে একবার এবং সেপ্টেম্বর মাসে পুনরায় এ কমিটি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করার সুপারিশ করা হলেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি সরকার। সুতরাং তরুণদের এ দাবি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহিতার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়নি। গণমাধ্যম এযাবৎকালে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করলেও সম্প্রতি পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর কয়েকটি ধারা-উপধারা তাদের সেই স্বাধীনতার কাজটি রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। সুতরাং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের পরিপৃর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে যেসব ধারা নিয়ে আপত্তি রয়েছে, তা সংশোধনের কিংবা বাতিলের অঙ্গীকার থাকতে হবে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ : একটি উন্নত দেশে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা থাকতে পারে না। দেশের ৯৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি। ফলে একই সিলেবাস, পরীক্ষা পদ্ধতি হওয়া সত্ত্বেও কেউ পাচ্ছে সিকি বেতন আবার কেউ পাচ্ছে পুরো বেতন, যা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সত্যিই বেমানান। এ থেকে উত্তরণে দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করে পুলিশের টিয়ার শেল, বুটের আঘাত আর লাঠিচার্জ ছাড়া কিছুই পায়নি। সুতরাং এ ধররেন দৃশ্য বারবার না দেখার ব্যবস্থাস্বরূপ সরকার এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট একটা সময়ের মধ্যে জাতীয়করণ করার ঘোষণা ইশতেহারে উল্লেখ করতে হবে।

চিকিৎসা খাতের নৈরাজ্য বন্ধ : বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে বেশ উন্নতি হলেও এখানে চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য আর বিশৃৃঙ্খলা। ডাক্তারের উচ্চমূল্য ফি গ্রহণ, কমিশন বাণিজ্যের জন্য যেকোনো মানহীন কোম্পানির ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ, মালিকের মনজয়ের জন্য অযথা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আইসিউ বাণিজ্য প্রভৃতিতে দেশের মানুুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এ খাতে শৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বন্ধ করে সেবার মানসিকতা ফিরে আনতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে। এ বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা যেতে পারে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ : সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে নেওয়া সরকারের জিরো টলারেন্স সব মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছে, একই সঙ্গে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ ধরনের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে দেশ থেকে দুর্নীতি সমূলে উৎপাটনের ঘোষণা থাকতে হবে নির্বাচনী ইশতেহারে।

বেকার ভাতা চালু : সরকার কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়ে সবাইকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উদ্ধৃত করছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে না পেরে দিন দিন বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে এসব যুবক। তারা না পারছে বিদেশ গিয়ে শ্রমিকের চাকরি নিতে, না পারছে দেশে লেবার কিংবা কৃষিকাজে মনোযোগী হতে। ফলে তাদের মধ্যে অনেকের এক ধরনের হতাশা তৈরি হয় আর এ হতাশা থেকে উত্তরণে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সাম্প্রতিক আত্মহত্যাগুলোর রিপোর্ট দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এ আত্মহত্যা ও হতাশা থেকে মুক্তি পেতে বেকার ভাতা চালুর বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে সংযুক্ত করা যেতে পরে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা : দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষত পুলিশ কাজ করবেÑএটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে নিজেদের দেশের রাজা মনে করে নিরাপরাধ লোককে ধরে নিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন সবশেষে মাসোহারা আদায় প্রভৃতির মাধ্যমে আজ পুরো বাহিনী ও তাদের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এ ছাড়া ২০০১ সাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষত পুলিশের বিরুদ্ধে দলীয় আনুগত্য কিংবা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারার অভিযোগ উঠেছে। আর যখন যে সরকার তখন তার পক্ষ নিয়ে কাজ করায় পুলিশ যেকোনো অনৈতিক কাজকে বৈধ করে, এমনকি সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, হয়রানি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্বৈরাচারী মনোভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এসব থেকে পুরোপুরি মুক্ত করে পুলিশ বাহিনীকে তাদের স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে খাঁটি জনগণের বন্ধু হতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বসহকারে প্রাধান্য পাওয়া উচিত। তাদের কর্মকান্ডে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহি আনায়নে রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে কাজ করতে হবে।

রেলপথের উন্নতি সাধন : বাংলাদেশের পরিবহন খাত নিয়ে রয়েছে স্বেচ্ছাচারী। পরিবহন মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সড়ক দুর্ঘটনা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, যানজটÑসব মিলে এ খাতে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যেভাবে সড়ক পথের উন্নয়নের জন্য যেকোনো সরকার কাজ করেছে, তার সিকিভাগও রেলপথ উন্নয়ন, নতুন রেল সংযোজক কিংবা নতুন রেলপথের কাজ হয়নি। অথচ, ঝুঁকিমুক্ত, আরাম, যানজটহীন, সঠিক সময়ে যাতায়াতের জন্য রেলের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলার অভ্যন্তরে রেলযোগাযোগ স্থাপন ও বিদ্যমান রেলপথগুলোয় ট্রেনের সংখ্যা ৫০ গুণ বৃদ্ধি করবে, সে নিশ্চয়তা রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে দেখতে চায় আজকের তরুণ প্রজন্ম।

কৃষকদের জন্য ভাতা চালু : কৃষকরা দেশের প্রাণ। অথচ এই কৃষকরা সমাজের সব থেকে বঞ্চিত। কখনো তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে লাভবান হয় আবার কখনো তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, এ পেশাকে সম্মানের চোখে না দেখায় এবং কোনো সরকারি ভাতা চালু না থাকায় নিরুপায় হওয়া ছাড়া এ পেশায় কেউ আসতে চায় না। কৃষিপেশায় আসতে তরুণদের একটি অংশকে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষকদের জন্য কৃষাণ-ভাতা ও দুটি উৎসব-ভাতা চালু করার বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে রাখতে হবে। এর ফলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সম্ভব হবে।

এ ছাড়া সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পুনর্ব্যবহার, রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা, সবার জন্য বয়স্ক-ভাতা চালু, আইনের শাসনের নিশ্চয়তা, সমনীতি বাস্তবায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ শতাংশ রাখা, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরো গতিশীল ও জবাবদিহির মধ্যে আনায়ন করা, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন প্রভৃতি নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করার জন্য তরুণসমাজের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক

adil_jnu@yahoo.com


Share this page: