Style Switcher
Theme Colors

শিক্ষাক্ষেত্রে রোল মডেল হব কবে?

শিক্ষাক্ষেত্রে রোল মডেল হব কবে?

শরীফুর রহমান আদিল
| সম্পাদকীয়

শিক্ষকতাকে সব পেশার আদি পেশা মনে করে এটিকে মহান হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই বিবেচনা করে আসছে সবাই। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সে মহান পেশাটি আর মহান না থেকে সবচেয়ে অবহেলিত ও খামখেয়ালি পেশায় পরিণত হয়েছে, পরিণত হয়েছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও গুরুত্বহীন পেশা হিসেবে। দেশের সবচেয়ে বড় পেশা হওয়া সত্ত্বেও এটি এখন নিগ্রহের শিকার। 
এছাড়াও নিম্নমানের বেতন কাঠামো, অপরিকল্পিত ও প্রয়োজনাতিরিক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, ম্যানেজিং কমিটি দ্বারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, অযথা খবরদারি, পদোন্নতি না থাকা, শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়নে অনীহা, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা, নামমাত্র ভাতা, অবহেলা, মেধাবীদের আকৃষ্ট না করা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকা, গবেষণায় বরাদ্দ না থাকা, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধায় আকাশসম বৈষম্য, শিক্ষক নিয়োগে তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্তদের সুযোগদান, শিক্ষকদের চাকরির অনিশ্চয়তা, এমফিল-পিএইচডিধারীদের উৎসাহ না দেওয়া, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা চালু না করাসহ রাজনৈতিক দলাদলিতে এ মহান পেশাটি অবহেলিত ও বঞ্চিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ দিনে দিনে উন্নত হচ্ছে। উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিশ্বদরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছি। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে চরম বৈষম্য, নিম্নমান আর অদক্ষতা বাংলাদেশের অর্জনকে মøান করে দিচ্ছে। যেমনÑ বিশ্ব শিক্ষকদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ভারকি ফাউন্ডেশন ২০১৮ সালে ‘হাউ টিচার স্ট্যাটাস ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বিভিন্ন দেশে শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের বাজেট কিংবা মূল্যায়ন, শিক্ষকের জীবনমান, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে কতটা আকর্ষণীয় প্রভৃতি বিষয়কে সামনে রেখে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল একেবারেই তলানিতে। 
ভারকি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন ছাড়াও বাংলাদেশে শিক্ষকদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা, শিক্ষকদের সমাবেশে লাঠিপেটা করা, কখনও টিয়ারশেল নিক্ষেপ অথবা বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে অনশন করা, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষায় চরম বৈষম্য পৃথিবীর বুকে জাতি হিসেবে আমাদের হীন করে তুলছে। তাই প্রশ্ন জাগে, শিক্ষকদের এ আন্দোলন আর কত করতে হবে? কবে আমরা উন্নয়নের মতো শিক্ষাতেও বিশ্বে রোল মডেল হব?
স্বাধীনতার পর থেকে সব সেক্টরেই কম-বেশি উন্নতি সাধিত হয়েছে; শিক্ষা কিংবা শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। ২০ বছরে বাংলাদেশ যেভাবে উন্নতি সাধন করেছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নতি করেনি শিক্ষা সেক্টরে। স¦াধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত সরকারি কলেজ হয়েছে মাত্র ৭০০টি! আর এসব প্রতিষ্ঠানের সবই শহরকেন্দ্রিক। ফলে গ্রাম কিংবা তৃণমূল পর্যায়ে এ সেবা পাচ্ছে না দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। সবার জন্য শিক্ষা সেøাগান বাস্তবায়নের পথে থাকলেও সবার জন্য সরকারি কিংবা কম খরচে শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। জনগণের দোরগোড়ায় অন্যান্য সরকারি সেবা যেভাবে মানুষ ভোগ করছে, সেভাবে গ্রামের খেটে-খাওয়া মানুষ ও তাদের সন্তানদের জন্য সরকারি শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ধনীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষা, গরিবের জন্য নিম্নমানের শিক্ষাÑ এ বৈষম্য প্রকট হচ্ছে; সঙ্গে সঙ্গে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, আর গরিবরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারছে না। 
আর শিক্ষকদের ক্ষেত্রে একই যোগ্যতাসম্পন্ন ও একই বিষয় এবং সিলেবাস শেষ করে একই কাজ সমাধা করলেও কেউ উচ্চ বেতনে, কেউ নিম্ন বেতনে, কেউ আবার সিকি বেতনে, আবার কেউ কেউ বিনা বেতনে চাকরি করেছেন এ পেশায়। কেউ বাসাভাড়া পেয়ে থাকেন উঁচু তলায়, কেউ সিকিভাগ পেয়ে থাকেন আধাপাকায়, আবার কেউ রাজপথে, কেউবা অনশন করে থাকেন ফুটপাতে! সরকারি শিক্ষকরা প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নত পেলেও বেসরকারি শিক্ষকরা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে। এ যদি হয় শিক্ষকদের অবস্থা; তবে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন, তা বুঝতে কারোই কষ্ট হওয়ার কথা নয়। সরকার যদি সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে চায়; তবে সরকারকে জাতীয়করণের পথে এগোতে হবে। ইউনেস্কোর সাবেক প্রধান ইরিনা বলেন, মানবাধিকার রক্ষা ও মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে, দারিদ্র্য দূর করে সবার জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে শিক্ষার মতো এত শক্তিশালী কোনো যন্ত্র নেই। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, মানবাধিকার রক্ষা, সম্মান বৃদ্ধি, দারিদ্র্য নির্মূল করতে গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, যা আমাদের দেশে একেবারেই অপ্রতুল। এ অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরে কয়েক দিন আগে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে; একইভাবে শিক্ষার হারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে পারছে না বলে মত দেন তিনি।
এ পেশাটি এতটাই অবহেলিত যে, ভারতসহ অন্যান্য দেশে জাতীয় পর্যায় ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলভেদে শিক্ষকদের পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে একমাত্র জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ পালন ছাড়া অন্য কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে শিক্ষকতাকে সম্মান করার প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শ্রেণিশিক্ষক নির্বাচিত হলেও সেক্ষেত্রে তাদের পুরস্কার হিসেবে থাকে না কোনো আর্থিক বরাদ্দ! শুধু একটা নিম্নমানের ক্রেস্ট আর সার্টিফিকেটই তার শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার। অথচ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের জন্য বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা থাকে; কিন্তু শিক্ষকদের ক্ষেত্রে শুধু জাতীয় পর্যায়ে সেরা হওয়া ছাড়া আর কোনো বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়নি। 
বাংলাদেশে ৪০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয় না। বলতে গেলে গবেষণাকে উৎসাহিত করতে কোনো বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয় না। নামমাত্র যে বরাদ্দ রাখা হয়, তা-ও অন্য খাতে ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। অথচ উন্নত বিশ্বে সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বেসরকারিভাবে যেসব গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকেও সরকার সহায়তা করে। এছাড়াও পদোন্নতিতে এমফিল-পিএইচডিকে এখনও সর্বস্তরে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারতেও কোনো স্কুল কিংবা কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হতে হলে উচ্চতর ডিগ্রি কিংবা এমফিল-পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। 
শিক্ষায় অপ্রতুল বাজেট আমাদের শিক্ষার মানকে নিম্ন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় বাজেটের ক্ষেত্রে বাজেটের আকার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু সে হিসাবে শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি পাচ্ছে না। টাকার অঙ্কে কিছু টাকা বাড়লেও জাতীয় বাজেটের শতকরা হিসাব করলে এটাকে হ্রাসই বলা যুক্তিসঙ্গত। যেমনÑ ২০১০-১১ বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪.২ শতাংশ; কিন্তু পরের বাজেটগুলোতে তা ক্রমান¦য়ে হ্রাস পেয়ে হয়েছে যথাক্রমে ১২.৪, ১১.৫ ও ১১.৪ শতাংশ। ২০১৭-১৮ বাজেটে এ খাতে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ১২.৬ শতাংশ করলেও কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ কমে তা দাঁড়ায় ১১.৪১ শতাংশে। 
জাতীয় বাজেটের শতকরার ভিত্তিতে হিসাব করলে দিন দিন এ খাতে বাজেট হ্রাস পাচ্ছে এবং বাজেটে এ খাত অনেকটা অনীহার শিকার হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বাংলাদেশ জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে খরচ করে, যা এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একেবারে নগণ্য। চীন একসময় তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিয়েছিল বেকারত্বের কারণে। কিন্তু আজ তারাও তাদের জিডিপির ৮ শতাংশ ব্যয় করছে শিক্ষা খাতে, ফলে চীনের পড়াশোনার মান মাঝারি থেকে প্রথম সারির দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। আর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ড প্রায় ৬ শতাংশ ও আমেরিকা ৫ শতাংশ ব্যয় করে। যদিও ঢাকা ঘোষণাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ জিডিপির অন্তত ২০ শতাংশ খরচ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; কিন্তু বাস্তবে ১০ শতাংশের বেশি এ খাতে বরাদ্দ দিচ্ছে না সরকার। এছাড়া দেশীয় শিক্ষাবিদরা শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ খরচসহ শিক্ষা খাতে বাজেটে বরাদ্দ বেশি রাখার যুক্তি উপস্থাপন করলেও দিন দিন এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তিকে গুলিয়ে ফেলে এ খাতে বরাদ্দ একেবারে তলানিতে রয়ে গেছে। 
যাই হোক, যখন ভাবী একটা স্বাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার শতকরা ৯৬ শতাংশই বেসরকারি! তখন এ খাতে সরকারের মনোভাব সহজেই অনুমান করা যায়। সুতরাং পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রীলঙ্কার মতো জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা খাতে মোট জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয় করতেই হবে। কোরিয়া তাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ায় তারা আজ উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে পরিণত হয়েছে। তারা শুধু কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে সমৃদ্ধশালী হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সব শিক্ষা খাতকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এসে একটা ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এবং উপরে উল্লিখিত শিক্ষক অবহেলার কারণগুলোর সমাধান করলে শিক্ষা খাতেও বিশ্বের মডেল হওয়া সম্ভব। হ

শরীফুর রহমান আদিল
শিক্ষক, গবেষক ও নীতি-বিশ্লেষক
 


Share this page: