Style Switcher
Theme Colors

Mashrafee In Politics/ মাশরাফির নির্বাচনে করা বিতক

মাশরাফির রাজনীতিতে যোগদান বিতর্ক

শরীফুর রহমান আদিল

 
  • ঢাকা , বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮

বেশ কয়েক দিন ধরেই মাশরাফি-সাকিবের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে বেশ জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। সাকিব ও মাশরাফি দু’জনই তাদের নমিনেশন পাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী থাকলেও সাকিবকে প্রধানমন্ত্রী খেলায় মনোযোগ দিতে বলায় এবার শুধু মাশরাফিই নমিনেশন নিয়েছেন। মাশরাফির নমিনেশন নেয়ার মধ্য দিয়েই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মাধ্যমে বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা। কেউ এটিকে ইতিবাচক আবার কেউ নেতিবাচক হিসেবে নিয়েই তাদের মন্তব্য প্রকাশ করছে। মাশরাফি বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের সফল অধিনায়ক বলেই তাকে নিয়ে এত মাতামাতি।

ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ঘটনা উপমহাদেশে এটিই প্রথম নয় বরং এশিয়া মহাদেশে যারা টেস্ট খেলে তাদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার ক্রিকেটাররাও রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। যেমন- পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, শ্রীলংকার সাবেক অধিনায়ক অর্জুন রানাতুঙ্গা রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বর্তমানে তিনি দেশটির পর্যটনমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছেন ভারতের কিংবদন্তি লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকার, সিধু, ভারতের সাবেক অধিনায়ক আজহার উদ্দিন, সাবেক পেসার প্রবীণ কুমারসহ অনেকে। পাকিস্তানের বুমবুম নামে পরিচিত শহীদ আফ্রিদিও রাজনীতিতে যোগ দেয়ার মনোবাসনার কথা জানান। কিন্তু উপরে যাদের কথা বলা হয়েছে তাদের কেউ কিন্তু অধিনায়ক কিংবা বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় রাজনীতিতে যোগ দেননি, বরং খেলা থেকে অবসর নেয়ার পরই তারা রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মাশরাফিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি বাংলাদেশের বর্তমান ওয়ানডে ক্রিকেটের অধিনায়ক থাকা অবস্থায় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচনের জন্য নমিনেশন নিয়েছেন। আর ভক্ত-সমর্থকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়াটা এ কারণেই একটু বেশি।

আরেকটি কারণ হলো- মাশরাফি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে সব দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে এক নম্বর খেলোয়াড়ের তালিকায় রয়েছেন; তাই তার ভক্তদের নেতিবাচক মন্তব্যের কারণটাও স্পষ্ট। তারা মাশরাফিকে সংকীর্ণ করতে চায় না, তার ভক্তরা মাশরাফিকে পাকিস্তানের ইমরান খানের মতো সার্বজনীন হওয়ার আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের পক্ষে তার নির্বাচনী মনোনয়ন কেনায় ভক্তরা কেউ তাকে ডাস্টবিনে কেউ ঘৃণার পাত্রে ফেলতে চান বলে বিভিন্ন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। এসব স্ট্যাটাস মাশরাফিকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নেয়ার জন্য নয় বরং তাদের প্রিয় খেলোয়াড় একপক্ষীয় হয়ে যাচ্ছেন এবং তারা তাদের মাশরাফিকে হারাতে চান না বলেই হয়ত এমন হঠকারী মন্তব্য দিয়ে তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। তাদের প্রশ্ন- মাশরাফি যদি সাংসদ নির্বাচিত হন তবে তিনি কি তার ক্রিকেট চালিয়ে নিতে পারবেন? মাশরাফির ইনজুরি ভক্তদের মনে যেভাবে দুঃখিত করত তার ভক্তদের সেই প্রতিদান এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর দিতে পারবেন তো? ২২ গজের মাঠকে তিনি রাজনীতির ধারায় ব্যবহার করবেন না তো? রাজনীতি করতে হলে কেন খেলাকে বিসর্জন দিতে হবে? বিশ্বকাপের পরে কি রাজনীতিতে যোগ দেয়া যেত না? অথচ তিনি নিজেই ২০১৯ সালের বিশ্বকাপের পর পর্যন্ত খেলে যাওয়ার মনোবাসনা প্রকাশ করেছিলেন। এবং ক্রিকেটবোদ্ধাসহ তার ভক্তরাও তাকে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজন বলে মনে করেন। বেশ কয়েক দিন ধরে মাশরাফি নিজেই টি-টুয়েন্টি ম্যাচে ফিরতে বারবার বলে গেছেন। কিন্তু হঠাৎ তার এমন সিদ্ধান্তে তার অনেক ভক্ত-সমর্থক ব্যথিত হওয়াটা খুব অমূলক নয়। কেননা, দর্শকরা মনে করেন দল থেকে দেশের স্বার্থ অনেক বড়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিত ছিল। একমাত্র তার নেতৃত্বগুণেই বাংলাদেশের ওয়ানডেতে এ শক্ত অবস্থান। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে তার নেতৃত্ব সত্যিই প্রয়োজন ছিল। কেননা, ভারতের শচীন টেন্ডুলকার যেভাবে দলের খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করতে পারতেন মাশরাফিও নিজে ভালো বোলিং করুক কিংবা না করুক দলকে উজ্জীবিত করে ম্যাচ জেতাতে অনেক উদাহরণ তিনি তৈরি করেছেন। তবে মাশরাফি যদি তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনগণকে নতুন, স্বচ্ছ ও কল্যাণমূলক রাজনীতির প্রর্বতনের চেষ্টা করেন, তাহলে এ জনপ্রিয়তাকে বিসর্জন দেয়ার জন্য তাকে সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত।

মাশরাফির মনোনয়নের ব্যাপারে অনেক দিক ইতিবাচক রয়েছে। যেমন- মাশরাফিকে নমিনেশন দেয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ইতিবাচক কিছু ঘটাতে চান, যা অন্য কোন রাজনীতিবিদদের দিয়ে সম্ভব নয়। আবার অন্যভাবে বলা যায়, মাশরাফিকে দিয়ে নড়াইলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মধ্যে একটা ভারসাম্য পরিবেশ তৈরি করা যাবে। কেননা, নড়াইলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে স্থানীয় কোন্দল খুব প্রকট। এ কোন্দল এতটাই যে, এখানে কোন্দল মেটাতে না পেরে ২০০১ সালের নির্বাচনে নড়াইল-১ ও নড়াইল-২ আসন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই প্রার্থী হন। এবার সেই কোন্দল আরও প্রকাশ্য হওয়ায় মাশরাফির মতো প্রার্থীর এখানে কোন বিকল্প নেই। শুধু স্থানীয় কোন্দলের অবসানই নয় বরং মাশরাফি নির্বাচনে জিতে এলে হয়ত তাকে অন্যান্য ক্রিকেটারের মতো পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কেননা, উপমহাদেশের যেসব ক্রিকেটার রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগকেই পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা গেছে। এদের মধ্যে শ্রীলংকার সাবেক বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা ও ভারতের সাবেক তারকা ক্রিকেটার সিধু অন্যতম। এসব ক্রিকেটারকে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার পর ওই মন্ত্রণালয়ে সফলতা লক্ষ্য করা গেছে। কেননা, তাদের পরিচিতি, ভাষা জ্ঞান, অন্যান্য দেশের পর্যটন এলাকার অবস্থা, সভ্যতা তারা যেভাবে রপ্ত করতে পারেন, অন্য রাজনীতিবিদরা সেভাবে এসব কিছু রপ্ত করতে পারেন না। তাই এ মন্ত্রণালয়ে মাশরাফির মতো একজন তারকা ক্রিকেটার প্রয়োজন।

মাশরাফিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়ার আরেকটি কারণ থাকতে পারে; আর সেটি হলো- আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে চমক দেখানোর গুঞ্জন চলছিল বেশ কয়েক দিন ধরেই। আর এই চমক হতে পারেন মাশরাফি। তবে আওয়ামী লীগের এ ধরনের চমককে খুব একটা নেতিবাচক হিসেবে দেখার তেমন সুযোগ নেই। কেননা, স্বচ্ছ ও জনগণের কল্যাণমুখী রাজনীতির কথা চিন্তা করতে হলে এ ধরনের প্রার্র্থীরও কোন বিকল্প নেই- এটাও সত্যি। সত্যি বলতে বঙ্গবন্ধুর পরে মাশরাফির মতো এরকম দল-মত, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে থেকে এত জনপ্রিয়তা অন্য কারও ভেতর এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। তাই তার রাজনীতিতে প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে যে কোন সমস্যা সমাধানে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় মাশরাফি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। মাশরাফি খেলার মাঠে সাধারণ একজন ভক্ত তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে নিরাপত্তা কর্মীরা যেভাবে তাড়া করেছিল, আর তাকে বাঁচানোর জন্য মাশরাফি যেভাবে বুকে টেনে নিয়ে নিরাপত্তা কর্মীদের হাত থেকে রক্ষা করলেনÑ এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি অন্যান্য দলের লোকদের এভাবে বুকে জড়াতে পারলে বাংলাদেশের রাজনীতির চেহারা নিমিষেই পাল্টে যাবে। ২২ গজের মাশরাফিকে দেখে গ্যালারিভরা দর্শকদের মাশরাফি-মাশরাফি বলে চিৎকারের প্রতিদান তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে দিতে পারলেই তিনি আবারও সবার মাশরাফি হয়ে উঠবেন। একই সঙ্গে বর্তমান তরুণদের মনে রাজনীতি নিয়ে অনাগ্রহ রয়েছে আবারÑ মাশরাফি তরুণ প্রজন্মের আইডল একজন। তরুণ অনেকে তাকে অনুসরণ করে ফলে মাশরাফির রাজনীতিতে আগমন বর্তমান তরুণদের একটি বড় অংশ যারা রাজনীতিকে পশ্চাদমুখী মনে করে সে থেকে মাশরাফির এ অবস্থান তরুণদের রাজনীতিমুখী করবে, যা বাংলাদেশের জন্য শুভই হবে। তবে এটি নিশ্চিত মাশরাফি যদি নিজের নামের পাশে সুবিচার করতে পারেন তবে দেশের রাজনীতির চেহারা অনেকাংশেই পাল্টে যাবে।

তবে এত ইতিবাচক দিকের মধ্যে কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। যেমন- মাশরাফির বর্তমানে ৯০ শতাংশ জনপ্রিয়তা থাকলে নমিনেশন কেনায় তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে ৭০ শতাংশে ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তার এ জনপ্রিয়তা নেমে আসবে ৪০-৫০ শতাংশে। অন্যদিকে, মাশরাফি রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য হিসেবে বলেছিলেনÑ মানুষের জন্য কিছু করা, অর্থাৎ সমাজসেবা করা। প্রশ্ন জাগে, এমপি মানেই কি সমাজসেবক? যারা আজকে পৃথিবীর বুকে সমাজসেবক হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের কি এমপি হতে হয়েছে? এমপি হয়ে সমাজসেবা করার জন্য যে পদক্ষেপ নিতেন, তাতে যে পরিমাণ মানুষের সাড়া পাবেন, এমপি না হয়ে সেরকম পদক্ষেপ নিলে তার মতো তারকা আরও বেশি সফল হতেন না? আমাদের একটা কথা ভুললে চলবে না যে, এমপিদের প্রধান কাজই হলো আইন প্রণয়ন করা। সেক্ষেত্রে তিনি সমাজসেবায় কতটুকু মনোযোগী হতে পারবেন তা দেখার বিষয়। মাশরাফি বাংলাদেশের সব দলের ঊর্ধ্বে একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন কিন্তু একটি দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তার পরিসর ছোট হয়ে যাবেÑ এটা মোটামুটি নিশ্চিত। এছাড়াও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার ব্যক্তিত্ব ও রুচিবোধ নিয়ে কতটুকু রাজনীতি করতে পারবেন নাকি পশ্চিমবঙ্গের মমতা-কবীর সুমন সম্পর্কের মতো হবেÑ সেটি এখন দেখার বিষয়।

যাই হোক, মাশরাফির আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে ইতিবাচক-নেতিবাচক যত মন্তব্যই থাক না কেন, মাশরাফি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে যেভাবে একেবারে খাদের কিনারা থেকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছেন, তিনি তার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতির দৃশ্যপটকে পাল্টে দিয়ে নতুন বাংলাদেশকে চেনাবেনÑ এটা আমরা আশা রাখি। একইভাবে বাংলাদেশে হানাহানি আর প্রতিহিংসার যে রাজনীতি বর্তমানে বিরাজমান সেগুলোর অবসান ঘটিয়ে মাশরাফি পুনরায় সারা দেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন। বাংলাদেশের সব দলের, সব ধর্মের, সব বর্ণের রাজনীতির উত্থান হবে এবং বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির প্রবর্তন করে নিজেকে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মাশরাফি হিসেবে পুনরায় পরিচিতি করাবেন। সেই সঙ্গে সবাইকে জানান দেবেন আপনাদের মাশরাফি ভুল করেননি বরং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে স্বচ্ছ, কল্যাণমুখী ও জবাবদিহিতার রাজনীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে মাশরাফি তার জনপ্রিয়তাকে বিসর্জন দিয়েছেন।

 

[লেখক : শিক্ষক]

adil_jnu@yahoo.com


Share this page: